Advertisement
অক্টোবর ২৩, ২০২৬

মেসিকে ঘিরে ঢাকায় ছড়িয়েছিল উন্মাদনা, স্মৃতিতে সেই দুই দিন

0
messi-dhaka

খেলা ডেস্ক:

ইতিহাসে কিছু কিছু দিন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ হয়েই থাকে না, হয়ে যায় অম্লান স্মৃতি। ২০১১ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর তেমনই দুটি দিন। দেশের ফুটবল ইতিহাসে দিন দুটি দর্শক-সমর্থকদের মনে গেঁথে থাকবে আজীবন।

বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি ৫ সেপ্টেম্বর এসেছিলেন ঢাকায়। সঙ্গে ছিল আর্জেন্টিনা জাতীয় দল। ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছে মেসির আর্জেন্টিনা, তাদের প্রতিপক্ষ ছিল নাইজেরিয়া।

মেসিদের বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা অনেক আগেই করেছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ওই বছর এপ্রিলে বাফুফের তৎকালীন সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া প্রীতি ম্যাচ হবে। তখন থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। বাফুফে এটাও জানিয়েছিল, চুক্তিতে মেসিসহ আর্জেন্টিনার বড় তারকাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি রাখা হয়েছিল।

ওই বছরের আগস্টে যখন দুই দলের খেলোয়াড় তালিকা প্রকাশ হয়, তখন উবে যায় সব সংশয়। মেসির সঙ্গে ছিলেন গনজালো হিগুয়েইন, অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, হ্যাভিয়ের মাচেরানো, সার্জিও আগুয়েরাসহ তারকা ফুটবলাররা। নাইজেরিয়ার দলে ছিলেন জন ওবি মিকেল, ভিনসেন্ট এনিয়েমাসহ পরিচিত অনেক মুখ।

উচ্ছ্বাস শুরু বিমানবন্দর থেকেই

৫ সেপ্টেম্বর সকাল। কলকাতা থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয় আর্জেন্টিনা দল। বেলা ১১টার দিকে মেসিদের বহনকারী বিমান অবতরণ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। মেসিদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের বাইরে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার সমর্থক। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সেখান থেকে দলটি সরাসরি ইন্টার কন্টিনেন্টাল (তৎকালীন রূপসী বাংলা) হোটেলে গিয়ে পৌঁছায়।

হোটেলে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক দৃশ্য। হোটেলের সামনে অপেক্ষা করছিলেন ভক্তরা। কারও হাতে জার্সি, কারও হাতে ছবি। মেসির একটি অটোগ্রাফ পাওয়ার আশায় কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। যারা জার্সি, টি-শার্ট কিংবা ডায়েরিতে মেসির অটোগ্রাফ পেয়েছিলেন তারা সেটাকে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেছিলেন।

অনুশীলনেও দর্শকের ঢল

সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার অনুশীলন ছিল। সেটিও পরিণত হয় বড় এক ঘটনায়। প্রায় ১০ হাজার দর্শক মেসিদের অনুশীলন দেখতে হাজির হয়েছিলেন। দেড় দশক আগে অনুশীলন দেখতে টিকিটের দাম ছিল গ্যালারিতে এক হাজার টাকা এবং ভিআইপি গ্যালারিতে দুই হাজার টাকা।

অনুশীলনে মেসি যখন বলের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, গ্যালারিতে উঠেছিল ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি। অনুশীলন হলেও দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল ম্যাচের মতোই। একটি ফ্রি-কিকের সময় পুরো স্টেডিয়াম যেন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল- সবাই অপেক্ষা করছিলেন মেসির জাদুর জন্য।

ম্যাচের দিন পূর্ণ ছিল গ্যালারি

৬ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই ঢাকার ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার একটাই বিষয়- মেসি। ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামজুড়ে ছিল আকাশি-সাদা পতাকা। টিকিটের দাম নিয়ে অবশ্য সমালোচনা ছিল। তবু মেসিকে সরাসরি দেখার আকাঙ্ক্ষায় গ্যালারি পূর্ণ হয়ে যায়।

মাঠে লড়াই চলছিল ২২ ফুটবলারের। তবে গ্যালারিতে আওয়াজ উঠতো কেবল মেসির পায়ে বল গেলেই। ম্যাচের শুরু থেকেই মেসি ছিলেন সক্রিয়। তিনি গোল করেননি, তবে করিয়েছেন। মেসির নিখুঁত চিপ থেকে গনজালো হিগুয়েইন প্রথম গোলটি করেছিলেন। ডি মারিয়ার ব্যবধান দ্বিগুণ করা গোলটির উৎসের কারিগরও ছিলেন মেসি। নাইজেরিয়া এক পর্যায়ে ম্যাচটির স্কোর ২-১ করলেও তাদের আত্মঘাতী গোলে আবার ব্যবধান বেড়ে যায় মেসিদের।

গোলের চেয়েও মেসির খেলা দর্শকদের বেশি মুগ্ধ করেছিল। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে তার এগিয়ে যাওয়া, নিখুঁত পাস এবং হিগুয়েইন ও ডি মারিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া- সবই হয়ে উঠেছিল ঢাকার দর্শকদের জন্য স্বপ্নময় একটি বিষয়। আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স খুব উজ্জ্বল না হলেও মেসি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন।

মেসিদের ঢাকা সফর শুধু একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের ঘটনাই ছিল না। সেই সময় বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের সক্ষমতা নিয়েও এটি ছিল বড় পরীক্ষা। বাফুফে আগেই বলেছিল, এমন ম্যাচ দেশের ফুটবলে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরবে।

তবে আয়োজন নিয়ে সমালোচনাও ছিল। ম্যাচের ঘোষণা থেকে শুরু করে টিকিট, সম্প্রচার এবং ব্যবস্থাপনা- বিভিন্ন বিষয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল। কলকাতায় আর্জেন্টিনা-ভেনেজুয়েলা ম্যাচে ব্যবস্থাপনার কিছু সমস্যা হওয়ায় ঢাকায় আয়োজকরাও সতর্ক ছিল।

সবকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি হয়ে যায় নির্বিঘ্নে। ৬ সেপ্টেম্বর রাতের পর আর্জেন্টিনা দল বাংলাদেশ ছাড়ে; কিন্তু মেসি চলে গেলেও তার সফরের রেশ থেকে যায় আরও বহুদিন।

বাংলাদেশে মেসির সেই সফর ছিল মাত্র দুদিনের। কিন্তু সেই দুদিনে বিমানবন্দর থেকে হোটেল, অনুশীলন থেকে জাতীয় স্টেডিয়াম- সবখানেই ছিল ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস। সবচেয়ে বড় কথা, টেলিভিশনের পর্দায় দেখা এক মহাতারকাকে সেদিন বাংলাদেশের হাজারো মানুষ সরাসরি মাঠে দেখেছিলেন।

২০১১ সালের সেই সফর তাই শুধু আর্জেন্টিনার ৩-১ গোলের জয় নয়, বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেটি মেসিকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক বিরল স্মৃতি। যে স্মৃতির কেন্দ্রে ছিল আকাশি-সাদা পতাকা, ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামের গর্জন আর বল পায়ে লিওনেল মেসির সেই জাদুকরী উপস্থিতি।

এই ফুটবল মহাতারকাকে বুধবারের পর আর বল পায়ে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে দেখা যাবে না। বেনিনের বিপক্ষে বুয়েন্স আয়ার্সের এস্টাডিও মনুমেন্টালে জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তুলে রাখবেন জার্সি-বুট। মহাতারকার বিদায়ী ম্যাচটি ঘিরে আবেগ ছড়াচ্ছে তার বাংলাদেশি ভক্তদের মনেও। মাঠে মেসিকে ভক্তরা আর দেখবেন না, তবে হৃদয়ে ধারণ করে রাখবে ২০১১ সালের উন্মাদনামুখর ওই দুটি দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

```html
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...
```