Advertisement
অক্টোবর ২৫, ২০২৬

ইয়েমেনে সৌদির সামরিক তৎপরতা, যুক্তরাষ্ট্রও সঙ্গে

0
10

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব, আর সেই অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরুর কথা বিবেচনা করছে রিয়াদ। সম্ভাব্য অভিযানে সৌদি বিমান হামলার পাশাপাশি রিয়াদের তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি স্থলবাহিনী অংশ নেবে বলে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ছয়জনের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের পরিধি নির্ভর করে দুটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার ওপর। প্রথমটি বাব আল-মান্দাব ঘিরে সীমিত পরিসরের উপকূলীয় অভিযান। দ্বিতীয়টি আরও বড় আকারের অভিযান, যেখানে ইয়েমেনের একাধিক ফ্রন্টে একই সঙ্গে হামলা চালানো হবে। তবে নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কথা বলার কারণে কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি।

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইয়েমেনে সৌদি আরবের অভিযানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। অন্যদিকে, কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ সৌদিকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে এসব মিত্র দেশের কেউ সরাসরি যুদ্ধের অংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না।

সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। ওই সময় হুতিরা রাজধানী সানা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে উৎখাত করার পর রিয়াদ আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে সেই সরকারকে সমর্থন করে। পরে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হয়, যা চলতি বছর পর্যন্ত মোটামুটি টিকে ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হুতিরা সৌদি নৌযান ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।

বাব আল-মান্দাব পুনর্দখলই প্রধান লক্ষ্য

সৌদির পরিকল্পিত অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো গত মাসে হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা ঠেকানো। ওই সময় হুতিরা ইয়েমেনের উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা এবং পশ্চিমা কূটনীতিকরা জানিয়েছেন। এই তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি।

বাব আল-মান্দাব হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের প্রবেশপথ। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথ হিসেবে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। চলমান ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার ভাষ্য, হুতিদের হাতে বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে নতুন করে শান্তি আলোচনায় বসা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে রিয়াদ। কারণ ওই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে।

বিস্তৃত অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হলে ইয়েমেনের আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশেও একই সময়ে অভিযান চালানো হতে পারে। অভিযানের মাত্রার ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনাকে এতে মোতায়েন করা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে অভিযান ঠিক কবে শুরু হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। পরিকল্পনা সম্পর্কে জানেন এমন ছয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, সময় নিয়ে অনুমান এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরুর সম্ভাবনা থেকে শুরু করে নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত বিস্তৃত।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি মনে করেন, সম্ভাব্য অভিযান সীমিত পরিসরের হতে পারে এবং ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় এর ব্যাপ্তি অবশ্যই কম হবে। তাঁর মতে, হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার আকাঙ্ক্ষা সৌদির থাকলেও বাব আল-মান্দাবের আশপাশে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়াও রিয়াদের প্রয়োজন।

র‌্যাটনি বলেন, আদর্শ পরিস্থিতিতে অভিযানটি উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনার জন্য তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা, সরাসরি যুদ্ধে নয়

ইসরায়েল গত তিন বছরে লেবাননে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার পর মধ্যপ্রাচ্যে হুতিরা ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি-নেতৃত্বাধীন নতুন অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপ্রবণ পরিস্থিতিতে নতুন একটি উত্তেজনাকেন্দ্র তৈরি করতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর থেকেই অঞ্চলজুড়ে সংঘাত চলছে। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির সম্ভাব্য অভিযান নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের মাত্রা বাড়াতে পারে।

সৌদি আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন সৌদির ইয়েমেন অভিযানকে সামরিক পরামর্শক ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। এর মধ্যে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ-সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে বলে এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন।

তবে মার্কিন সহায়তার পরিধি সীমিত থাকতে পারে। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি বিমান হামলার মতো সামরিক সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক সহায়তা

সৌদি আরব গত মাসে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশ দুটি সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে, যা ইয়েমেনে সৌদি অভিযানকে সহায়তা করছে।

এক পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা জানান, গত মাসে পাকিস্তান চারটি কার্গো বিমানে করে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের সদর দপ্তর এডেনে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। এসব সরঞ্জামের মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা।

আরেক পাকিস্তানি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা ও এক পশ্চিমা কূটনীতিকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করতে পাকিস্তানি সামরিক পরামর্শকরাও ইয়েমেনে অবস্থান করছেন। চলমান যুদ্ধের আগে সৌদি আরব যে তুর্কি ড্রোন কিনেছিল, সেগুলোও ইয়েমেনের আকাশে মোতায়েন করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

ইয়েমেনে নতুন অভিযান শুরু করলে সৌদি আরবের অন্যতম বড় উদ্বেগ হবে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের তেল স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ কারণে রিয়াদ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সহায়তা চেয়েছে।

দ্বিতীয় পাকিস্তানি কর্মকর্তার দাবি, সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত রক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পাকিস্তান ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। গত বছর থেকে কয়েক দফায় এসব সেনা সৌদিতে পৌঁছেছে এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়ার পরও আরও সেনা গেছে।

তবে পাকিস্তান ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে ওই কর্মকর্তা জানান।

পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

এদিকে ফ্রান্স জানিয়েছে, রেড সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবুকে সুরক্ষা দিতে সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠাবে তারা।

ইয়েমেনি বাহিনীর ভেতরেই বড় বিভাজন

সম্ভাব্য স্থল অভিযান অনেকটাই নির্ভর করবে ইয়েমেনের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর। গৃহযুদ্ধের আগের পর্যায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যেসব ইয়েমেনি যোদ্ধা গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, সেসব বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীই সম্ভাব্য স্থল অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশা বলেন, হুতিদের মতো সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালিয়ে তাদের পিছু হটানোর জন্য অনেক হুতিবিরোধী বাহিনী এখনো যথেষ্ট সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়। একই সময়ে হুতিরা একাধিক ফ্রন্টে চাপ তৈরি করায় এসব বাহিনী বর্তমানে কঠিন পরীক্ষার মধ্যেও রয়েছে।

গত শীতকালে ইয়েমেনি বাহিনীর বিভাজন আরও গভীর হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলে কিছু এলাকা দখল করে বিচ্ছিন্নতার পরিকল্পনা ঘোষণা করার চেষ্টা করেছিল। পরে কয়েক দফা সংঘর্ষের পর সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়।

সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি শিহাবি সম্ভাব্য অভিযানের ফলাফল নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, সবকিছু নির্ভর করবে স্থলবাহিনীর কার্যক্রমের ওপর।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত অগ্রাধিকার ছিল স্থলভাগে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করা এবং ফ্রন্ট স্থিতিশীল করা। তবে তারা অবশ্যই আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাবে। তাঁর মতে, অভিযানের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় বাহিনীগুলোর সক্ষমতা ও কার্যকারিতার ওপর।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের এই সম্ভাব্য অভিযান এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার, রেড সাগরে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে উঠে এসেছে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

```html
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...
```