Advertisement
অক্টোবর ২৩, ২০২৬

দুর্গাপূজায় যাত্রীদের যাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে তিন পথেই প্রস্তুতি

0
bus-2610180314

সবার সংবাদ ডেস্ক:

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে ঘরমুখী ও ভ্রমণপ্রত্যাশী মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সড়ক, রেল ও নৌপথে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে বিশেষ বাস ও ট্রেন চালু, অতিরিক্ত ফেরি ও লঞ্চ প্রস্তুত রাখা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মেরামত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিটের কালোবাজারি, যানজট ও পরিবহন খাতে অনিয়ম রোধে মাঠে থাকবে প্রশাসন। এ লক্ষ্যে সারাদেশে ৩৫টি মোবাইল কোর্ট প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দীর্ঘ ছুটিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের অনেক মানুষও পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়ি কিংবা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণে যেতে পারেন। ফলে ছুটির শুরুতে রাজধানী ছাড়ার সময় এবং ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পথে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিবহনব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

সমন্বিত প্রস্তুতিতে গুরুত্ব

দুর্গাপূজা উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে গত ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় সড়ক, রেল ও নৌপথ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সভায় জানানো হয়, টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এ সময়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি ও পরিবহন খাতে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ, ফেরিঘাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, টিকিটের কালোবাজারি রোধ এবং যাত্রীসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভায় যাত্রীচাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ বাস সার্ভিস চালু, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফেরি প্রস্তুত রাখা এবং পরিবহন খাতের অনিয়ম রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর টোল প্লাজায় যানবাহনের চাপ সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

রেলপথে যাত্রীচাপ সামাল দিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজার রুটে তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য রুটেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে। একই সঙ্গে ট্রেনের টিকিটে অনিয়ম ও কালোবাজারি রোধে কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সড়কপথে যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে রাজধানী ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সাময়িক মেরামতের মাধ্যমে চলাচলের উপযোগী রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছুটির শুরুতে ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতুর টোল প্লাজায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য যানজট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নৌপথে ফেরি-লঞ্চের বাড়তি প্রস্তুতি

নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ঈদের ছুটির আদলে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান।

তিনি বলেন, যাত্রাপথে মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে ছুটি শুরুর আগেই সদরঘাটসহ দেশের বিভিন্ন নৌবন্দর ও টার্মিনালকে প্রস্তুত রাখা হবে। পাশাপাশি পাটুরিয়াসহ দেশের ১২ থেকে ১৩টি সচল ফেরিঘাটে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীচাপ বৃদ্ধি পেলে অতিরিক্ত ফেরি ও লঞ্চ পরিচালনারও প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ছুটির সময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন নৌবন্দর ও ফেরিঘাটে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে মোতায়েন করা হবে। তারা মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও নৌযান চলাচল সার্বক্ষণিক তদারকি করবেন। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকেও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

৩৫ মোবাইল কোর্ট, বাড়তি নিরাপত্তা

ছুটির সময়ে সড়ক, ফেরিঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে যানজট নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম রোধ এবং যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হবে। পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসার সদস্যদেরও দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত করা হবে।

সড়ক বা ফেরিঘাটে কোনো জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে ২৫ থেকে ৩০ জন অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে মোট ৩৫টি মোবাইল কোর্ট প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। এসব মোবাইল কোর্ট অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট ও পরিবহন খাতের অনিয়ম এবং যাত্রী হয়রানির অভিযোগে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।

ফেরিঘাটে নজরদারি জোরদারে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া বাস প্রবেশ রোধে নির্মাণ করা হয়েছে স্থায়ী ব্যারিকেড। পাশাপাশি ফেরিতে যানবাহন ওঠানামার সময় দুর্ঘটনা এড়াতে নির্ধারিত নিয়ম মেনে বাস ও অন্যান্য যানবাহন ওঠানামা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।

আবহাওয়া ও সদরঘাট ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর

ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে ঝড় ও বৈরী আবহাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে নৌযান চলাচল ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি নৌবন্দরগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণেও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী জানান, জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ পথে যানজট কমানো গেলে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলগামী যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হবে এবং সড়কপথের ওপর চাপও কিছুটা কমবে।

তিনি আরো বলেন, বড় লঞ্চে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। তাই নৌপথের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে সড়কপথে যাত্রীদের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এ কারণে নৌবন্দর ও ফেরিঘাটের কার্যক্রম সচল রাখা এবং যাত্রীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তা পরিমল রায় বলেন, দুর্গাপূজার শেষ দিনে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য জনসমাগম ও যান চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপ ও বিসর্জনস্থল ঘিরে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এ সময় সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সড়ক, রেল ও নৌপথে নেওয়া এসব প্রস্তুতির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে দুর্গাপূজার ছুটিতে মানুষের যাতায়াত কতটা নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক হবে। বিশেষ বাস ও ট্রেন পরিচালনা, ফেরিঘাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী নৌযান চলাচল নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিটের কালোবাজারি ও অন্যান্য অনিয়ম রোধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

```html
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...
```