মিরপুরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিলেন শাকিল
ছবি: সংগৃহীত
সবার সংবাদ ডেস্ক:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মিরপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর বর্ণনা দিয়েছেন ‘ক’ গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধা মো. শাকিল আহম্মেদ।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আন্দোলনে যোগ দিতে গেলে এক পুলিশ সদস্য তার সামনে থাকা এক ব্যক্তির পেটে পিস্তল ঠেকিয়ে বলেন, ‘পেছনে চলে যা, নয়তো গুলি করে দেবো।’
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক প্যানেলে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন শাকিল।
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন তিনি।
শাকিল বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে তিনি মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনে যোগ দেন। পরদিন স্টেডিয়ামের সামনে গিয়ে দেখেন, পুলিশ ও সিভিল পোশাকের কয়েকজন রাস্তা আটকে রেখেছেন। মিরপুর-১০ নম্বরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে পুলিশ তাদের গালিগালাজ করে।
‘একজন পুলিশ তার কোমরে থাকা পিস্তল আমার সামনে থাকা একজন এলাকার বড় ভাইয়ের পেটে ঠেকিয়ে গালি দিয়ে বলে, পেছনে চলে যা, নয়তো গুলি করে দেবো। তখন আমরা মিরপুর-১ এর দিকে চলে আসি।’
পরে প্রায় আধঘণ্টা পর মিরপুর আলোক হাসপাতালের পথ দিয়ে মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়ে আবারও আন্দোলনে যোগ দেন বলে জানান তিনি।
শাকিলের ভাষ্য, মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টির গলিতে যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান, পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর ‘বৃষ্টির মতো গুলি’ চালাচ্ছে।
এ সময় গুলিতে মোস্তাকিন বিল্লাহ নামে এক আন্দোলনকারী আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। শাকিলসহ আরও দুজন তাকে ধরে গলির ভেতরে নিয়ে যান। মোস্তাকিনের মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
আরেকজন আন্দোলনকারীর পেটে গুলি লাগে। তাকেও কয়েকজন মিলে উদ্ধার করে রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। শাকিল জানান, ওই দুইজনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও তার মোবাইল ফোনে রয়েছে। পরে জানতে পারেন, মোস্তাকিন মারা গেছেন।
খাটের নিচে লুকিয়েছিলাম
জবানবন্দিতে শাকিল ৪ আগস্টের ঘটনারও বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরে গিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। সেখানে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজনকে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাতে দেখেন।
‘প্রতি দশ সেকেন্ড পরপর একেকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। অন্যরা তাদের আলোক হাসপাতাল ও আল হেলাল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল।’
একপর্যায়ে মিরপুর-১০ নম্বরে ফুটপাতে থাকা হকারদের একটি খাটের নিচে লুকিয়ে পড়েন শাকিল। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখেন, একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন।
তাকে উদ্ধারে খাটের নিচ থেকে বের হয়ে দাঁড়াতেই একটি গুলি তার বাম নিতম্বের ভেতর দিয়ে ঢুকে পেটের ভেতর দিয়ে ডান রানের গোড়া দিয়ে বের হয়ে যায় বলে জানান তিনি। এ সময় সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে তার গুলির ক্ষতস্থানগুলো দেখান।
শাকিল বলেন, গুলিটি তার নিতম্ব দিয়ে ঢুকে পায়খানার রাস্তা ছিঁড়ে মাংসসহ বের হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি আন্দোলনকারীদের কাছে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যান।
‘একটু সামনে যাওয়ার পর আর পারছিলাম না। তখন এক ভাইয়ের ঘাড়ে হাত দিয়ে বলি, ভাই আমি আর পারছি না, আমাকে বাঁচান। এরপর আমি পড়ে যাই।’
পরে কয়েকজন আন্দোলনকারী তাকে উদ্ধার করেন। ওই সময় পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে উদ্ধারকারীদের কাছে তার মায়ের ফোন নম্বর দিয়ে দেন বলে জানান তিনি। এরপর দুই-তিনবার কালেমা পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন শাকিল।
প্রথমে তাকে আলোক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কিছুটা জ্ঞান ফেরার পর পাশে পরিবারের সদস্যদের দেখতে পান তিনি।
এখনও স্বাভাবিক হয়নি পায়খানার রাস্তা
জবানবন্দিতে শাকিল জানান, পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি থাইল্যান্ডেও চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। তবে চিকিৎসার পরও তার পায়খানার রাস্তা স্বাভাবিক হয়নি।
তিনি বলেন, ‘পায়খানার রাস্তা সংকুচিত হয়ে গেছে। প্রতিদিন ডায়লেশনের মাধ্যমে আমাকে পায়খানা করতে হয়। আমার ডান পায়ের মেইন আর্টারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লাইগেশন করে দেওয়া হয়েছে। আমি শক্ত খাবার খেতে পারি না। সবসময় তরল জাতীয় খাবার খেতে হয়।’
সালমান-আনিসুলকে দায়ী করেন শাকিল
জবানবন্দিতে শাকিল দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা এবং আনুমানিক ২৫ হাজার আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ করে আহত বা পঙ্গু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কারফিউ জারির সিদ্ধান্তের পর আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়।
শাকিলের দাবি, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, কারফিউ জারির পেছনে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের ভূমিকা ছিল। তাদের একটি অডিও ভাইরাল হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার এই অবস্থার জন্য এবং আন্দোলনে যে সমস্ত ব্যক্তিদের নিহত ও আহত করা হয়, তার জন্য সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হককে দায়ী করি। আমি তাদের বিচার চাই এবং আমার যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাই।’
অভিযোগ কী
চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের ধারাবাহিক নির্দেশনা ও কর্মকাণ্ডের ফলে মিরপুর-১, ২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র হামলায় বহু ছাত্র-জনতা নিহত হন।
এসব নির্যাতন বন্ধে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
