Advertisement
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ: মফস্বল থেকে শহর—সংকট উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ দরকার

0
Heavy-Load-Shedding

মো: সরওয়ার হোসেন:

দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাইকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শহরাঞ্চলেও লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়; আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মফস্বল এলাকায় ভোগান্তি বেশি

লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় চাপ সাধারণত পড়ে মফস্বল ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের ওপর। শহরের তুলনায় এসব এলাকায় বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সীমিত। অনেক পরিবারে জেনারেটর বা আইপিএসের মতো বিকল্প ব্যবস্থা রাখার সক্ষমতাও নেই। দিনে রাতে ১০ থেকে ১৫ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। সব মিলিয়ে বিভিন্ন সময়ে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। গরমের সময়ে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের কষ্ট আরও বেড়ে যায়।

ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দোকানপাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক মেশিন, কম্পিউটার, ফটোকপিয়ার, প্রিন্টার কিংবা অন্যান্য যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ না থাকলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারেন না। ফলে উৎপাদন কমে, সময় নষ্ট হয় এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি বাড়ে।

শহরেও লোডশেডিং বাড়লে উদ্বেগ আরও গভীর

একসময় তুলনামূলকভাবে শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও এখন বিভিন্ন শহরে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ বাড়ছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল বিতরণব্যবস্থার কোনো একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন ও বিতরণ—পুরো ব্যবস্থার সমন্বিত সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

শহরে বিদ্যুৎ সংকট বাড়লে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অনলাইনভিত্তিক কাজ ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়।

কেন এই সংকট?

বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, গ্যাসের সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক ত্রুটি, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সীমাবদ্ধতা এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়া—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা। কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সঞ্চালন বা বিতরণ অবকাঠামো দুর্বল হলে গ্রাহকের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব নয়।

সরকারের গুরুত্ব দেওয়া জরুরি

বিদ্যুৎ সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতি বছর গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে—এটি অনুমানযোগ্য। তাই চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগে থেকেই উৎপাদন, জ্বালানি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকার মানুষ যেন দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের শিকার না হন, সে বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কোথায় কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে না—এ বিষয়ে স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত সময়সূচি থাকলে মানুষ অন্তত নিজেদের কাজ পরিকল্পনা করতে পারেন। কিন্তু কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া বারবার বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। সরকারের স্পষ্ট বার্তা জনগণকে না দেওয়া সরকারের একটি দুর্বল পরিচালনা।

জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের সম্পর্ক সরাসরি। গ্যাস, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় উৎসকে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো প্রয়োজন

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে সিস্টেম লস কমানো গেলে একই পরিমাণ উৎপাদন থেকে বেশি গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে।

এ ক্ষেত্রে পুরোনো বিদ্যুৎ লাইন ও ট্রান্সফরমার আধুনিকায়ন, অতিরিক্ত চাপযুক্ত সাবস্টেশনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্বল বিতরণ নেটওয়ার্ক দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

শিল্প ও কৃষিকে বিশেষ অগ্রাধিকার

লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয় না; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও জাতীয় অর্থনীতি জড়িত। তাই শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা থাকা দরকার।

একইভাবে কৃষিতেও বিদ্যুতের গুরুত্ব রয়েছে। সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং সময়মতো সেচ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষকে তথ্য জানানো দরকার

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি কমাতে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। কোন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম কেন, কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া উচিত।

বিদ্যুৎ সরবরাহের পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনলাইনে ও স্থানীয় পর্যায়ে সহজভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে মানুষ যেমন প্রস্তুতি নিতে পারবেন, তেমনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিও বাড়বে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানই সবচেয়ে জরুরি

লোডশেডিং কমাতে শুধু জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা বা সাময়িকভাবে উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

এই পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, সঞ্চালনব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বিতরণ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনা—সবকিছুকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ সংকটের বোঝা যেন বারবার সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে। মফস্বলের একজন শিক্ষার্থী যেমন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অধিকার রাখেন, তেমনি একজন শহরের ব্যবসায়ী, গ্রামের কৃষক কিংবা একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়—এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই লোডশেডিংকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সাময়িক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এর মূল কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

জনজীবন ও অর্থনীতিকে স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আজকের লোডশেডিং যদি পরিকল্পিতভাবে মোকাবিলা করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই সংকট গভীর হওয়ার আগেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।

সম্পাদক ও প্রকাশক, সবার সংবাদ ডট কম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...