ভোলার চোখ শুধু বরিশালে, অথচ খুলছে ঢাকার দুয়ার
রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা মহাসড়ক বদলে দিতে পারে চার উপজেলার যোগাযোগ ও অর্থনীতি
মো: সরওয়ার হোসেন, সবার সংবাদ:
দ্বীপ জেলা ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন—সড়কপথে বরিশালের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ এখন সামনে এসেছে, তার গুরুত্ব শুধু বরিশাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রস্তাবিত রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে ভোলার মানুষের সামনে খুলে যেতে পারে রাজধানী ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের পথ। একই সঙ্গে হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও মুলাদীর মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাতেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন।
গত ২২ আগস্ট ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য আলোচিত একাধিক প্রস্তাবের মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত এই রুটটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
যে পথ ভোলাকে শুধু বরিশাল নয়, ঢাকার সঙ্গেও যুক্ত করবে
প্রস্তাবিত রুটটির দিকে ভৌগোলিকভাবে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ভোলা থেকে সড়কপথে মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা–রহমতপুর হয়ে বরিশালের জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। রহমতপুরে পৌঁছানোর পর বিদ্যমান সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বরিশাল হয়ে রাজধানী ঢাকার দিকে যাওয়া সম্ভব হবে।
অর্থাৎ ভোলাবাসীর জন্য এটি কেবল ‘ভোলা–বরিশাল সড়ক’ নয়; এটি হতে পারে ভোলা–মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা–রহমতপুর–বরিশাল–ঢাকা যোগাযোগের একটি নতুন করিডোর।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভোলা–মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা–রহমতপুর অংশে প্রায় ২১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ভোলা–মেহেন্দিগঞ্জ অংশে একটি এবং মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা অংশে দুটি—মোট তিনটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। তিন সেতুর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘শুধু বরিশাল’ ভাবলে বড় সুযোগটি চোখ এড়িয়ে যেতে পারে
ভোলার মানুষের একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই বরিশালকে কেন্দ্র করে সড়ক যোগাযোগের কথা ভাবছেন। কারণ বরিশাল হচ্ছে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
কিন্তু প্রস্তাবিত মহাসড়কের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হলো—বরিশালকে গন্তব্য না বানিয়ে বরিশালকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ঢাকায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ফলে ভোলার কোনো ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে বরিশালে যেতে পারবেন, আবার প্রয়োজন হলে সেই পণ্য একই সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ঢাকার বড় বাজারেও পাঠাতে পারবেন। রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী কিংবা সাধারণ যাত্রীদের জন্যও এটি একটি বিকল্প ও তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগপথ তৈরি করতে পারে।
হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জের জন্যও এটি বড় পরিবর্তন
এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সড়কটি ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকা হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জকেও জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের কাছাকাছি নিয়ে আসবে।
বর্তমানে নদীনির্ভর যোগাযোগের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত অনেকাংশে নৌযান ও ফেরির ওপর নির্ভরশীল। নতুন সড়ক বাস্তবায়িত হলে সেই নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জকে এই নতুন সড়ক নেটওয়ার্কের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুলাদী। বরিশাল–মুলাদী–হিজলা সড়কটি ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। বিভিন্ন সময়ে সড়ক ও সেতুর দুরবস্থার কারণে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের মানুষের যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার খবরও এসেছে।
তাই নতুন মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগটি শুধু একটি জেলার প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর আঞ্চলিক গুরুত্ব কম মূল্যায়ন করা হবে। বরং এটি বরিশালের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী ও ভোলাকে একটি সমন্বিত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বদলে যেতে পারে ব্যবসা-বাণিজ্যের চিত্র
সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে প্রথম সুবিধা পাবেন কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষ।
ভোলার মাছ, কৃষিপণ্য, তরমুজসহ বিভিন্ন পণ্য বর্তমানে দেশের বড় বাজারে নিতে নদীপথ ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। সড়ক যোগাযোগ সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন হলে দ্রুত পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়বে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি উৎপাদকরা বড় বাজারে সরাসরি পণ্য পাঠানোর সুযোগ পেতে পারেন।
একইভাবে হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও মুলাদীর মাছ ও কৃষিপণ্যও বরিশাল ও ঢাকার বাজারে দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।
ফলে সড়ক নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন, গুদাম, বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, যন্ত্রাংশ, পণ্য পরিবহনসহ নানা ধরনের নতুন ব্যবসা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখনো এটি স্বপ্ন থেকে বাস্তবায়নের পথে
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে মানেই সড়কটি এখনই চালু হয়ে যাচ্ছে না। নতুন সড়ক, বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু নির্মাণ, ভূমি ও কারিগরি যাচাইসহ বিভিন্ন ধাপ পেরোতে হবে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও সামনে রয়েছে।
এ কারণে এই অঞ্চলের মানুষের এখন প্রধান প্রত্যাশা শুধু ঘোষণা নয়—দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প প্রণয়ন, অর্থায়ন এবং বাস্তব নির্মাণকাজ শুরু করা।
সেতু ও মহাসড়ক—দুটিই হতে হবে টেকসই
ভোলাকে সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও ভোলার একটি অংশ সরাসরি ভোলা–বরিশাল সেতুর দাবিও তুলেছে।
তবে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা রুটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি বাস্তবায়িত হলে ভোলার যোগাযোগ শুধু একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের ওপর নির্ভর করবে না। বরং ভোলা একটি আঞ্চলিক সড়ক করিডোরের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তাই ভোলাবাসীর চোখ যদি শুধু বরিশালের দিকে থাকে, তাহলে হয়তো তারা এই উদ্যোগের পুরো সম্ভাবনাটি দেখছেন না।
কারণ এই সড়ক বরিশালমুখী হলেও এর শেষ গন্তব্য শুধু বরিশাল নয়—রহমতপুর হয়ে এটি খুলে দিতে পারে রাজধানী ঢাকার পথও।
আর সেই পথের সঙ্গে একসঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা ও আশপাশের জনপদের মানুষের জন্য।
এই কারণে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো আঞ্চলিক অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে।
