Advertisement
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

১৭ বছরের চাকরির অনিশ্চয়তা, অফিসে স্ট্রোক করে সাগরের মৃত্যু: ইসির ডাটা এন্ট্রি নিয়োগ ঘিরে নতুন প্রশ্ন

0
nid

চাকরি থাকবে কি না—সহকর্মীর কাছে ছিল সাগরের আকুতি; রেখে গেলেন যমজ দুই সন্তান

নিজস্ব প্রতিনিধি, সবার সংবাদ ডট কম:

পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের আইডিইএ প্রকল্পের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সাগর হালদার আর নেই। আজ সকাল ১১টা ৫ মিনিটে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মাত্র অল্প বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে সহকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তিনি রেখে গেছেন তাঁর স্ত্রী ও দুটি ছোট্ট যমজ সন্তান। তাঁর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে ভান্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সাগর হালদার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। দ্রুত তাঁকে বরিশালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ তাঁর মৃত্যু হয়।

১৭ বছর কাজের পরও চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ

সাগর হালদার দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে নির্বাচন কমিশনের আইডিইএ প্রকল্পের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন বলে সহকর্মীরা জানিয়েছেন। একই সময়ে তিনি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে চলমান নিয়োগ পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

সম্প্রতি ওই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, বৈষম্য ও প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। ৪৬৮টি ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগের জন্য ২০১৯ সালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় ধরে নিয়োগ কার্যক্রম বিভিন্ন জটিলতায় আটকে ছিল।

এক লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে ২০২৩ সালের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় অংশ নেন ১৮ হাজার ৮১৫ জন। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সবাইকে লিখিত পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ করা হয়। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশনার পর আইডিইএ-২ প্রকল্পের ৭৪৭ জন কর্মীকে নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা ছাড়াই লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।

এ নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিধিমালা অনুসরণের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ।

‘চাকরি তো নাই, কী করমু?’—সহকর্মীর কাছে সাগরের আকুতি

সাগরের মৃত্যুর পর তাঁর এক সহকর্মীর বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনে কর্মরত এক ডাটা এন্ট্রি অপারেটর জানান, অসুস্থ হওয়ার আগে সাগর তাঁকে ফোন করে চাকরি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন।

ওই সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর ফোনে বলেছিলেন—

“চাকরি তো নাই, কী করমু? মা অসুস্থ। স্ত্রী-বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবো? কিছু একটা করেন, চাকরি তো নাই।”

সহকর্মীর দাবি, দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও নিজের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে সাগর প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় ছিলেন। নতুন নিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তাঁকে মানসিকভাবে চাপে ফেলেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

‘১৭ বছর শ্রম দেওয়ার পরও অনিশ্চয়তা’

সাগরের সহকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পরও আইডিইএ প্রকল্পের কর্মীদের চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং একই পদে নতুন নিয়োগ কার্যক্রম চলায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তাঁদের প্রশ্ন—যে কর্মীরা বছরের পর বছর জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনসহ নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনায় শ্রম দিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অবদানের মূল্যায়ন কীভাবে হবে?

সহকর্মীদের কেউ কেউ সাগরের আকস্মিক অসুস্থতা ও মৃত্যুর সঙ্গে চাকরির অনিশ্চয়তাজনিত মানসিক চাপের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাঁর স্ট্রোক ও মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে চাকরিসংক্রান্ত মানসিক চাপকে নিশ্চিত করার মতো কোনো চিকিৎসা প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আগের অভিযোগের সঙ্গে মিলছে নতুন প্রশ্ন

এর আগে নির্বাচন কমিশনের ৪৬৮টি ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগকারীদের দাবি, নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে উত্তীর্ণ করা হয়েছে এবং আইডিইএ প্রকল্পের ৭৪৭ জনকে পরীক্ষা ছাড়াই লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরও কয়েকজন আবেদন না করেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং একই সিরিয়ালে একাধিক পরীক্ষার্থীকে পাস দেখানো হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

যদিও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়া আইন ও বিধিবিধান অনুসারেই পরিচালিত হচ্ছে এবং আদালতের নির্দেশনাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

সাগরের মৃত্যু কি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, নাকি বড় প্রশ্নেরও ইঙ্গিত?

সাগর হালদারের মৃত্যু এখন আইডিইএ প্রকল্পের দীর্ঘদিনের কর্মীদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর কাজ করার পরও চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, একই পদে নতুন নিয়োগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে প্রকল্পের কর্মীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

সাগরের সহকর্মীদের দাবি, তাঁর মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ৪৬৮টি ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সাগর হালদারের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত সহকর্মীরা তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর রেখে যাওয়া ছোট্ট যমজ সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তায় না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...