Advertisement
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

দেশে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে আজ

0
ec

অনলাইন ডেস্ক:

দেশে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট)। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমদ।

সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ব্যবস্থা অবশ্য নতুন নয়। এর শুরু ১৯৯১ সালে, যখন দীর্ঘ সামরিক ও রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রিক শাসনের পর বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা কমে সাংবিধানিক পদে রূপ নেয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দায়িত্ব যায় সংসদের হাতে।

এই পরিবর্তনের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে যে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির পক্ষে ছিল, তারাই কেন কয়েক মাসের মধ্যে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফেরার উদ্যোগ নিল।

এরশাদের পতনের পর যে রাজনৈতিক সমঝোতা
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসন আরো শক্তিশালী হয়। দীর্ঘ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দলমত–নির্বিশেষে সবাই আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৯০ সালের শেষ দিকে সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করলে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। তার সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্য বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে নির্বাচনের আগে ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান এক ছিল না।

নির্বাচনের আগে দুই দলের অবস্থান
আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি অব্যাহত রাখার পক্ষে ছিল। তৎকালীন গবেষণাতেও বিএনপির এই অবস্থানের কথা উঠে এসেছে। 

ক্রেইগ ব্যাক্সটারের ১৯৯২ সালের এশিয়ান সার্ভের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

অর্থাৎ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দুই দলের সামনে সরকারব্যবস্থার প্রশ্নে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ চাইছিল সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে, বিএনপি চাইছিল রাষ্ট্রপতি শাসন অব্যাহত রাখতে। কিন্তু নির্বাচনের ফল পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়।

নির্বাচনের ফলেই বদলে গেল হিসাব
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে ১৪০টি পায়। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫ এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন। পরে সংরক্ষিত নারী আসন যোগ হয়ে বিএনপির মোট আসন দাঁড়ায় ১৬৮।  ৩৩০ সদস্যের সংসদে বিএনপি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় দল এবং সরকার গঠন করে। ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

এখানেই রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির আগের অবস্থানের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বজায় থাকলে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র থাকত রাষ্ট্রপতির পদে। কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হলে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হতো প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল।

ফলে নির্বাচনের পর বিএনপির হাতে থাকা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন সরকারব্যবস্থায় আরো সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। তৎকালীন গবেষণাতেও বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে এই রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিএনপির ভেতরেও বদলাচ্ছিল মত
শুধু বিরোধী দলের চাপেই বিএনপির অবস্থান বদলেছিল বিষয়টি এত সরল ছিল না। নির্বাচনের পর দলটির ভেতরেও সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একদিকে আওয়ামী লীগ সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে। অন্যদিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া গণতান্ত্রিক ঐকমত্যও নতুন করে সামনে আসে।

দলটির সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি দুই ধরনের ব্যবস্থার পক্ষেই মত আসে। আবার মিশ্র কাঠামোর পক্ষেও মত ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে বিএনপির নেতৃত্ব ও সংসদীয় দলের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন শক্তিশালী হয়।

২ জুলাই বিএনপিই আনল পরিবর্তনের বিল
শেষ পর্যন্ত ২ জুলাই ১৯৯১ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন করেন। বিলটির লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া।

আওয়ামী লীগও একটি পৃথক সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব দেয়। দুই পক্ষের প্রস্তাবের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি, সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা এবং মন্ত্রিসভায় সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিসহ কয়েকটি বিষয়ে পার্থক্য ছিল। বিরোধগুলো মেটাতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে ১৫ সদস্যের একটি সিলেক্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি আলোচনার পর ঐকমত্যে পৌঁছায়। এরপর ৬ আগস্ট সংশোধনী বিলটি সংসদে অনুমোদনের জন্য তোলা হয়।

৩০৭-০ ভোটে ফিরে এল সংসদীয় সরকার
৬ আগস্ট ১৯৯১ জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল ৩০৭-০ ভোটে পাস হয়। এরপর বিষয়টি গণভোটে যায়। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব সরে যায়। প্রধানমন্ত্রী হন সরকারের নির্বাহী প্রধান, মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হয় এবং রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। 

একই সঙ্গে উপরাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান কার্যকর হয়। ১৯৯১ সালের সংশোধনী শুধু সরকারব্যবস্থার পরিবর্তন করেনি; পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক ভিত্তিও তৈরি করেছিল।

গণভোটে ৮৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’
সংসদে পাস হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ দ্বাদশ সংশোধনী নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ফল অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৩ লাখের বেশি ভোট সংশোধনীর পক্ষে এবং প্রায় ৩৪ লাখ ভোট বিপক্ষে পড়ে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়।

তারপর কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন?
এখানেই ১৯৯১ সালের ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার অর্থ রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত হওয়া নয়। বরং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বদলে যায়। তিনি আর সরকারের নির্বাহী প্রধান নন; রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান।

তাই নতুন ব্যবস্থায় একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হয়। দ্বাদশ সংশোধনীর পর সংসদ সদস্যদের ভোটেই সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি হয়। ৮ অক্টোবর ১৯৯১ জাতীয় সংসদে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। আওয়ামী লীগ প্রার্থী করে সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে।

৩৩০ সদস্যের সংসদে আবদুর রহমান বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ৬৬ জন সদস্য ভোট দেননি। ১০ অক্টোবর আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এটি ছিল সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের প্রথম পরোক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

তাহলে বিএনপি কেন অবস্থান বদলাল?
১৯৯১ সালের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার: দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের পর সেই গণতান্ত্রিক ঐকমত্য সরকারব্যবস্থার প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে থাকে।

নির্বাচনের পর ক্ষমতার সমীকরণ: বিএনপি ১৬৮ আসন নিয়ে ৩৩০ সদস্যের সংসদে সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হলে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার মাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষমতা আরো সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন গবেষণায়ও এই রাজনৈতিক সুবিধার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

বিরোধী দলের রাজনৈতিক চাপ:  আওয়ামী লীগ নির্বাচনের পর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সক্রিয় ছিল। ফলে সরকারকে এই প্রশ্নে রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নিতে হয়।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ মত পরিবর্তন: দলটির সংসদীয় দল ও নেতৃত্বের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকে। ফলে পরিবর্তনটি শুধু বিরোধী দলের দাবির প্রতিক্রিয়া ছিল না; বিএনপির নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও এটি পরিণত হয়।

সবশেষে, ১৯৯১ সালের পরিবর্তনকে শুধু একটি দলীয় অবস্থান বদল হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা যাবে না। এটি ছিল এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন, নির্বাচনের ফল, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত সবকিছুর সমন্বিত ফল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...